মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

বাতায়নের ঘটনাপুঞ্জ

পাহাড়ঘেরা সবুজে ভরা গ্রামটির নাম বরইতলী। একসময় খুব বেশি বরইয়ের ফলন হতো, তাই এই নাম। সবুজের বুকে এখন লাল গোলাপের ঢেউ। গোলাপ গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই গ্রাম ফুলের সৌরভ ছড়ায় সারা বছর। ছোট-বড় দুই শতাধিক বাগানে উৎপাদিত ফুল বিক্রি করে স্বাবলম্বী হচ্ছে গ্রামের লোকজন। চকরিয়া উপজেলার এই গ্রামে বর্তমানে ফুলের বাগানের পাশে চাষ হচ্ছে তামাক, আর তামাকের বিষে নীল হচ্ছে ফুলের বাগান। 
সাবলম্বী শতাধিক বেকার যুবক: এলাকার প্রথম গোলাপ চাষি মইনুল ইসলামের তিন একরের বাগানের পশ্চিম পাশে অধ্যাপক আফসারুজ্জামানের দুই একরের বাগান। পাশে মাস্টার সিরাজুল ইসলামের আড়াই একর, হারুন আর রশিদের এক একর, আবদুর রফিকের দুই একর, এনাম উল্লাহ ও সাবেত উল্লাহর দুই একরের গোলাপ বাগানেও ফুলের সমাহার। বাগানে গাড়িবোঝাই করে গোলাপ সরবরাহ করা হয় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার শহরে। 
গোলাপ বাগান মালিক সমিতির সভাপতি আফসারুজ্জামান বলেন, ‘বর্তমানে বরইতলীর প্রায় ১০০ একর জমিতে গোলাপের চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে সমিতির ৪৮ সদস্যের রয়েছে প্রায় ৮০ একর বাগান। গোলাপ চাষ করে সাবলম্বী হওয়ার জন্য আমরা শিক্ষিত বেকারদের উৎসাহিত করছি।’ 
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্ব পাশে পাহাড়ি এলাকায় গোলাপ বাগান রয়েছে ৩০টি। পশ্চিম পাশে ফসলি জমিতে রয়েছে ২০টি। অন্যগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে গ্রামে। মেরেন্ডা (লাল), রাম্বা (হলুদ), জরিনা সুন্দরী (রোদে রং পরিবর্তন হয়), লিংকন (গাঢ় লাল) গোলাপ চাষ হয় বাগানে। 
গোলাপের কদর সারা বছর: গোলাপ বাগান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সারা বছর চাহিদা থাকে গোলাপের। চাষও হয় বছরজুড়ে। তবে শীত মৌসুমে ডিসেম্বর-এপ্রিলে গোলাপের চাহিদা থাকে বেশি। কারণ এ সময়ে বিয়ে, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, পয়লা বৈশাখ, ভ্যালেন্টাইনস ডেসহ বিভিন্ন উৎসব থাকে।’ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাগানের ৮০ শতাংশ গোলাপ সরবরাহ করা হয় চট্টগ্রাম শহরের চেরাগী পাহাড়ের দোকানে। অবশিষ্ট গোলাপ যায় কক্সবাজার শহরে। ১০০ ফুল বিক্রি হয় ৮০০ টাকায়। চাহিদা কমে গেলে দামও কমে যায়, অনেক সময় ১০০ ফুল ১০০-১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। 
মইনুল ইসলাম জানান, তাঁর তিন একর বাগানে গোলাপ রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার। বাগান করতে প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ হয়। ফুল ও গাছ থেকে তৈরি চারা বিক্রি করে আয় হয় ১২ লাখ টাকা। এতে তাঁর লাভ প্রায় ছয় লাখ টাকা। 
জানা যায়, জানুয়ারির শুরুতে গোলাপ চারা রোপণ করা হয়। দোআঁশ, বেলে ও পলিমাটিতে গোলাপ চাষ হয়। আগে ভারত থেকে চারা এনে এখানে গোলাপের চাষ করা হতো। এখন প্রতিটা বাগানে চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। রোপণের দুই মাস পর গাছে ফুল ধরতে শুরু করে। মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে একটি গাছে ১০-১৫টি ফুল ধরে। তখন প্রতিদিন একটি গাছ থেকে একটি করে ফুল কাটা হয়। 
মইনুল ইসলামের বাগানে চারা উৎপাদন করেন যশোরের ঝিকরগাছা থেকে আসা বেলাল হোসেন। বেলাল জানান, ‘প্রায় ২০ বছর ধরে চারা উৎপাদনের কাজ করছি। ছোট বেলায় ভারতে গিয়ে চারা তৈরির কৌশল রপ্ত করি। বর্তমানে দিনে ৪০০-৫০০ চারা তৈরি করতে পারি। প্রতিটি ১৫-২০ টাকায় বিক্রি হয়।’ চারা উৎপাদনে রাসায়নিক সারের পাশাপাশি ৫০ গ্রাম ওজনের জৈব সার (গোবর) দিয়ে চোখ কলম তৈরি হয় বলে তিনি জানান। 
বাগানের শ্রমিক নুর মোহাম্মদ (৩০), সনাতন পাল (৪৫) জানান, ‘সকাল সাতটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত আমাদের কাজ করতে হয়। পানি সরবরাহের পাশাপাশি বাগানের গোলাপও কাটতে হয় তাঁদের। কিন্তু মাসিক বেতন দেওয়া হয় তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। ফুল চুরি ঠেকাতে রাতেও বাগানে পাহারা দিতে হয়।’
ফুলের বাগানে তামাকের বিষ
চাষিরা জানান, আগে প্রতি কানি জমি পাঁচ-ছয় হাজার টাকায় বর্গা নিয়ে গোলাপ চাষ করা হতো। কিন্তু এখন ২০ হাজার টাকা দিতে হয়। কারণ এলাকার কিছু প্রভাবশালী প্রতি কানি জমি ২০ হাজার টাকায় বর্গা নিয়ে তামাক চাষ করছেন। অতি লাভের আশায় জমির মালিকেরা বর্তমানে তামাক চাষের জন্য জমি ইজারা দিচ্ছেন। ফলে গোলাপ বাগান কমে যাচ্ছে। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন মালিক জানান, গোলাপের দাম ভালো বলে ২০ হাজার টাকা দিয়ে জমি নিয়ে বাগান করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু দাম কমে গেলে চাষিরা আর্থিক সংকট ও লোকসানের মুখে পড়বেন। তখন অনেকে গোলাপ চাষ ছেড়ে দিতে পারেন। 
নারী শ্রমিকের বেতন অর্ধেক!
বড়ইতলীর আলমনগর গ্রামের রহিমা বেগম (৩২) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাগানে শ্রমিকের কাজ করেন। নারী শ্রমিক পারিশ্রমিক পান মাত্র ৯০ টাকা। অথচ একই কাজ করে একজন পুরুষ শ্রমিক পান দ্বিগুণ অর্থাৎ ১৮০ টাকা। বর্তমানে ৬০টির বেশি বাগানে দুই শতাধিক নারী শ্রমিক বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।
রহিমা বেগম জানান, ‘গরিব মানুষ। তাই কম বেতনে চাকরি করতে হয়। না হলে ছেলেমেয়েরা না খেয়ে মরবে।’ একই কথা জানান, বড়ইতলীর ধলিয়ারছড়া গ্রামের আয়েশা বেগম, সখিনা খাতুন ও মর্জিনা আকতার। 
বাগানের শ্রমিক মোস্তাক আহমদ জানান, ‘নারী শ্রমিকেরা পুরুষের সমান কাজ করলেও বেতন পান অর্ধেক। এতে তাঁদের অভাব দূর হচ্ছে না।’ 
অবশ্য ভিন্ন কথা বলেন গোলাপ বাগান মালিক সমিতির সভাপতি আফসারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘কিছু বাগানে নারীদের অর্ধেক বেতন পরিশোধ করেন। কারণ নারীরা পুরুষের মতো কাজ করতে পারেন না।

 

ছবি/সংযুক্তি

 

ক্রম

ছবি


সংযুক্তি



Share with :

Facebook Twitter